ছায়ার কলম পর্ব ৪
যার নাম উচ্চারণেই দরজা খুলে যায়...
স্মৃতি রাতে আর ঘুমাতে পারেনি।
খাতা, আয়না, জানালা — সবকিছু যেন তাকে ঘিরে ফেলেছে।
সে টেবিলে বসে খাতার পেছনের পাতাগুলো উল্টে দেখে,
তাতে প্রতিদিন সে যা লিখেছে — সব অদৃশ্য!
শুধু একটা নাম বারবার জ্বলজ্বল করছে —
“ঈশান...”
❝সে কখনও এই নাম লেখেনি।❞
ঘরের বাতি নিভে গেল হঠাৎ।
দেয়াল ঘেঁষে কেউ ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে — পায়ের ছায়া দেখা যাচ্ছে কেবল।
সে ঠকঠক করে উঠে জানালার কাছে যায়, পর্দা সরায়…
সামনে দেখা যায় —
একটা ছেলেকে, মাটিতে বসে সে লিখছে।
কিন্তু তার হাতে কোনো খাতা নেই —
সে লিখছে বাতাসে, আর প্রতিটা অদৃশ্য শব্দ এসে স্মৃতির খাতায় বসে যাচ্ছে।
সে তাকায় —
ছেলেটির গা নেই, মুখ নেই — কেবল একজোড়া জ্বলন্ত চোখ, আর কাঁধের ওপরে ঝুলে থাকা চুল।
তার কণ্ঠস্বর এবার স্পষ্ট:
"তুমি যখন প্রথমবার কলম ধরেছিলে, তখন আমি শ্বাস ফেলেছিলাম। এখন তুমি প্রতিবার লিখলে, আমি এক পা এগিয়ে আসি। আর মাত্র তিনটি বাক্য... তারপর আমরা এক হবো।"
স্মৃতি কাঁপা হাতে খাতায় লেখে:
❝“আমি কি তোমাকে সৃষ্টি করেছি?”❞
সেই মুহূর্তে দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে যায়…
আর জানালার বাইরে গাছের ফাঁকে —
একটা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে থাকে,
তার চোখের নিচ থেকে রক্ত ঝরে, আর ঠোঁটে ফিসফিস করে ওঠে:
“না, তুমি নিজেই আমার গল্পের চরিত্র। তুমি সৃষ্টি নও, তুমি অভিশাপ...”
স্মৃতি ঘুমাতে পারছে না।
সে এখন জানে — এই খাতা, এই ছেলেটি, আর তার লেখা… সবকিছুর মাঝে এক অদৃশ্য বন্ধন।
সে পুরোনো বইয়ের তাক ঘেঁটে এক পুরনো ডায়েরি খুঁজে পায়, পাতাগুলো হলদে হয়ে গেছে।
মাঝের একটা পাতায় লেখা:
“জানালার ছেলেটা কারও নয়। সে জন্মায় শব্দে, বেঁচে থাকে কল্পনায়। যে তাকে চিনে ফেলে, সে তার গল্প হয়ে যায়…”
❝ডায়েরির নিচে ছেলেটির নাম — ঈশান।❞
❝তার মৃত্যু হয়েছিল আজ থেকে ১০ বছর আগে — ঠিক এই তারিখে, এই ঘরে।❞
ঘরের বাতাস হঠাৎ ভারি হয়ে যায়।
আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বে সে আর নিজেকে দেখতে পায় না —
বরং সেখানে বসে আছে একটা মেয়ে, চুলগুলো সামনে ঝুলে পড়েছে, তার হাতে সেই অভিশপ্ত খাতা।
মেয়েটি ধীরে ধীরে তাকায় —
আর তার চোখে জল নয়, কালি গড়িয়ে পড়ছে।
সে ফিসফিস করে বলে:
"তুমি ভাবছো তুমি লেখক? না, তুমি কেবল সেই পৃষ্ঠার শেষ বাক্য, যেটা ঈশান লেখা শেষ করতে পারেনি..."
স্মৃতি বুঝতে পারে — সে এখন আর বাস্তবের কেউ নয়।
সে এখন একটা অসমাপ্ত গল্প।
আর সেই গল্পের লেখক হলো — এক মৃত আত্মা।
সেই মুহূর্তে খাতার প্রথম পাতায় রক্ত দিয়ে লেখা হয়ে যায়:
❝এই গল্প যেখান থেকে শুরু হয়েছিল, সেখানেই শেষ হবে।

Comments
Post a Comment